জান্নাতের প্রতিটি ভবন এক ইট স্বর্ণের, এক ইট রুপার, গাঁথুনি খাঁটি কস্তুরীর

জান্নাতের প্রতিটি ভবন এক ইট স্বর্ণের, এক ইট রুপার, গাঁথুনি খাঁটি কস্তুরীর

মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ): মানুষ দুনিয়ায় একটি সুন্দর বাড়ির জন্য সারা জীবন পরিশ্রম করে। জমি কেনে, নকশা করে, ইট-বালু-সিমেন্ট জমায়, ঋণ করে শুধু একটা মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য। অথচ এই ঘর একদিন তাকে ছেড়ে যাবে, নয়তো সে ঘর ছেড়ে যাবে। মুমিন বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলা পরকালে এমন এক চিরস্থায়ী ভবন প্রস্তুত রেখেছেন, যার একটি ইট সোনা দিয়ে, আরেকটি রুপা দিয়ে, আর যার গাঁথুনির মসলা হলো খাঁটি কস্তুরী।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফল। আর পার্থিব জীবন প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছু নয়। (সুরা আলে ইমরান: ১৮৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জান্নাতের প্রাসাদের নির্মাণসামগ্রী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, জান্নাতের একটি ইট সোনার, আরেকটি ইট রুপার। তার গাঁথুনির মসলা খাঁটি কস্তুরী, তার কঙ্কর মণি-মুক্তা ও ইয়াকুত, আর তার মাটি জাফরানের মতো সুগন্ধময়।(জামে আত-তিরমিজি: ২৫২৬)

সহিহ বুখারিতে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুটি জান্নাত এমন, যার পাত্র ও ভেতরের সবকিছু রুপার তৈরি। আর দুটি জান্নাত এমন, যার পাত্র ও ভেতরের সবকিছু সোনার তৈরি। (সহিহ বুখারি: ৪৮৭৯)

আর মুসনাদে আবু ইয়ালার একটি সহিহ বর্ণনায় এসেছে, জান্নাতিরা সবুজ মণি-মুক্তা ও লাল ইয়াকুত পাথরে নির্মিত প্রাসাদে প্রবেশ করবে। এই বর্ণনাগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে বোঝা যায় জান্নাতের প্রতিটি ভবন কোনো রাজমিস্ত্রির হাতে তৈরি নয় তার প্রতিটি কণা গড়েছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা, যিনি চাইলে মাটিকে জাফরান আর পাথরকে সোনা বানাতে পারেন।

দুনিয়ার মানুষ যে সোনার জন্য জীবন উৎসর্গ করে, প্রতিযোগিতা করে, অস্থির থাকে সেই সোনাই জান্নাতে হবে দেয়াল গাঁথার সাধারণ ইট। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরে এই সত্যকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন, দুনিয়াতে সোনা-রুপা যেখানে মানুষের লোভ-লালসার বস্তু, জান্নাতে তা নিছক নির্মাণসামগ্রী মাত্র। এর অর্থ একটাই প্রকৃত সম্পদ ও মর্যাদা সোনায় নেই, আছে আল্লাহর নৈকট্যে।

জান্নাতের মূল্য বোঝাতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, তোমাদের কারো ধনুক পরিমাণ বা বেত-চাবুক পরিমাণ জান্নাতের জায়গা দুনিয়া ও তার মধ্যেকার সবকিছুর চেয়ে উত্তম। (সহিহ বুখারি: ৬৫৬৮, ২৮৯২; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪৩৩০; জামে তিরমিজি: ১৬৪৮)

পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের কোষাগার, প্রতিটি স্বর্ণখনি, প্রতিটি রাজপ্রাসাদ একত্র করলেও তা জান্নাতের এক বেত রাখার জায়গার সমান হবে না। যে সামান্য জায়গার মূল্য এত, সেই জান্নাতে যখন একটি গোটা ভবনই সোনা-রুপা-কস্তুরী দিয়ে গড়া, তার মূল্য কল্পনা করার সাধ্য কোনো মানুষের নেই।

জান্নাতের প্রাসাদ কোনো বিচ্ছিন্ন স্থাপনা নয়। সুরা যুমারের ২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, মুত্তাকিদের জন্য থাকবে একটির ওপর আরেকটি নির্মিত সুউচ্চ প্রাসাদ, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে। সুরা মুহাম্মদের ১৫ নম্বর আয়াতে চার ধরনের নহরের কথা এসেছে, স্বাদ-গন্ধ অপরিবর্তনীয় পানির নহর, দুধের নহর, নিরাপদ ও সুস্বাদু শরাবের নহর, এবং পরিশোধিত মধুর নহর। এসব কোনো সংকীর্ণ নালায় বন্দি নয়, জান্নাতের বিস্তৃত সমতল ভূমি দিয়ে জান্নাতিদের ইচ্ছানুযায়ী প্রবাহিত হবে। দুনিয়ার পানি দূষিত হয়, দুধ নষ্ট হয়। কিন্তু জান্নাতের কোনো নিয়ামতেই কোনো ক্ষয় বা পচন নেই।

সুরা আল-কাহফের ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, জান্নাতিদের সোনার কঙ্কন দিয়ে অলংকৃত করা হবে, তারা পরিধান করবে সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমি সবুজ পোশাক এবং সুশোভিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে।

সহিহ মুসলিমে হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বরাতে এসেছে, জান্নাতে এমন একটি স্থান থাকবে, যেখানে জান্নাতিরা প্রতি জুমার দিনে সমবেত হবে। তখন সুগন্ধি বাতাস তাদের চেহারা ও পোশাকে সুবাস ছড়িয়ে দেবে এবং সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেবে (সহিহ মুসলিম: ২৮৩৩)।

আর এই সমাবেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে আল্লাহ তাআলার দিদার। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিয়ামতের দিন কি তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে দেখতে পাবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জবাবে বলেন, মেঘমুক্ত আকাশে দুপুরের সূর্য বা পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে যেমন কোনো অসুবিধা হয় না, তেমনি কোনো বাধা ছাড়াই তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে দেখতে পাবেন (সহিহ মুসলিম: ২৮৩৪)।

জান্নাতের সোনা-রুপার ভবন, নহর, বাগান, সবই মহান নিয়ামত। কিন্তু কোরআন জানিয়ে দিয়েছে, এর চেয়েও বড় কিছু আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড়। (সুরা আত-তাওবা: ৭২)

হাদিসে এসেছে, জান্নাতিদের সব নিয়ামত দেওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর তাঁর চিরস্থায়ী সন্তুষ্টি ঘোষণা করবেন এবং জানাবেন, এরপর তিনি আর কখনো তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন না (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর ইহইয়া উলুমুদ্দিন গ্রন্থে লিখেছেন, জান্নাতের এই বস্তুগত বর্ণনা মূলত মানুষের সীমিত বোধশক্তির কাছে অসীম নেয়ামতকে উপলব্ধিযোগ্য করার একটি মাধ্যম মাত্র। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই বলেছেন, আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের জন্য এমন নিয়ামত প্রস্তুত করেছেন, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে যার কল্পনাও উদয় হয়নি (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। অর্থাৎ সোনা-রুপার ইট আমাদের জন্য কেবল একটি জানালা আসল দৃশ্য এর চেয়েও বহুগুণ উজ্জ্বল।

দুনিয়ার বাড়ির জন্য মানুষ প্রতিদিন হিসাব করে কত অর্থ জমল, কতটা ইট লাগবে। অথচ জান্নাতের সোনার ইট জমা হয় ভিন্নভাবেপ্রতিটি নামাজে, প্রতিটি সিজদায়, প্রতিটি গোপন সদকায়, প্রতিটি আন্তরিক তওবায়। হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, যে ব্যক্তি জান্নাতের প্রকৃত মর্যাদা অনুধাবন করে, তার কাছে দুনিয়ার সব চাকচিক্য তুচ্ছ হয়ে যায় তবে এই প্রাসাদ কেবল আকাঙ্ক্ষা দিয়ে নয়, আমল দিয়েই অর্জিত হয়।

হে আল্লাহ, আমাদের দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ যেন আপনার চিরস্থায়ী জান্নাত থেকে আমাদের বঞ্চিত না করে। আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, আমাদের ঈমান দৃঢ় করুন, আমাদের নামাজ-কোরআন-সদকা-তওবা কবুল করুন, আর আপনার অসীম রহমতে আমাদের সবাইকে সেই সোনা-রুপা-কস্তুরীর প্রাসাদের অধিকারী করুন। যেখান থেকে আমাদের আর কখনো বের হতে হবে না।

Comments (0...)

No comments yet

Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Your comment will be reviewed before being published.

Have an account? Sign in

Loading...

সর্বশেষ খবর

কক্সবাজারে রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে ১০ মৃত্যু, মালিক-ম্যানেজারের বিরুদ্ধে মামলা

কক্সবাজারে রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে ১০ মৃত্যু, মালিক-ম্যানেজারের বিরুদ্ধে মামলা

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ - সন্ধ্যা ৭:০৫ মি.
ওমরার পথে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত কুমিল্লার মাদরাসাশিক্ষক নাসরুল্লাহ, অসহায় স্ত্রী-সন্তান

ওমরার পথে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত কুমিল্লার মাদরাসাশিক্ষক নাসরুল্লাহ, অসহায় স্ত্রী-সন্তান

১২ অক্টোবর, ২০২৬ - ভোর ৪:৫৫ মি.
রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২ বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত, গভীর শোক সম্মিলিত ইমাম খতিব পরিষদের

রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২ বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত, গভীর শোক সম্মিলিত ইমাম খতিব পরিষদের

১২ অক্টোবর, ২০২৬ - ভোর ৪:৩৯ মি.
ভোলার লালমোহনে ভাড়া বাসা থেকে মাদরাসাশিক্ষকের নিথর দেহ উদ্ধার, পরিবারের দাবি ‘পরিকল্পিত হত্যা’

ভোলার লালমোহনে ভাড়া বাসা থেকে মাদরাসাশিক্ষকের নিথর দেহ উদ্ধার, পরিবারের দাবি ‘পরিকল্পিত হত্যা’

১০ অক্টোবর, ২০২৬ - সকাল ৮:০৭ মি.
হজের যেকোনো একটি ফরজ বাদ পড়লে হজ বাতিল বলে গণ্য হবে, ক্ষতিপূরণে তা শুদ্ধ হবে না

হজের যেকোনো একটি ফরজ বাদ পড়লে হজ বাতিল বলে গণ্য হবে, ক্ষতিপূরণে তা শুদ্ধ হবে না

০৭ অক্টোবর, ২০২৬ - সকাল ৬:৪২ মি.
ডিএমপির ১১ পরিদর্শককে ঢাকার বাইরে বদলি

ডিএমপির ১১ পরিদর্শককে ঢাকার বাইরে বদলি

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ - রাত ১১:৩২ মি.
জামায়াত মুখে সহযোগিতা দেখালেও সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে, রাশেদ খাঁন

জামায়াত মুখে সহযোগিতা দেখালেও সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে, রাশেদ খাঁন

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ - সকাল ৯:১১ মি.
মডেল মসজিদে যুক্ত হলো খতিবের পদ, বাড়ল ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী

মডেল মসজিদে যুক্ত হলো খতিবের পদ, বাড়ল ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ - সকাল ৯:৩৬ মি.
দেওবন্দি ভাবধারাই উম্মাহর ভারসাম্য, আলেমদের হাত ধরে সুদৃঢ় হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত দ্বীনি সম্পর্ক

দেওবন্দি ভাবধারাই উম্মাহর ভারসাম্য, আলেমদের হাত ধরে সুদৃঢ় হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত দ্বীনি সম্পর্ক

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ - সকাল ৯:০৪ মি.
রাজস্ব খাতের অর্থ ছাড়াই ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব, মুফতি আজহারুল ইসলাম

রাজস্ব খাতের অর্থ ছাড়াই ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব, মুফতি আজহারুল ইসলাম

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ - সকাল ৮:৫৬ মি.

সর্বাধিক পঠিত

১

মেঘনার তীরে ভোরের হাঁকডাক, দেশি মাছের টানে ছুটে আসেন দূরদূরান্তের ক্রেতারা

৯৮০ বার পড়া হয়েছে
২

গোপালগঞ্জে ইমাম প্রশিক্ষণে শেখ হাসিনার প্রশংসা, জুলাই আন্দোলনকারীদের ফাঁসির হুমকির অভিযোগ

৭৯৪ বার পড়া হয়েছে
৩

ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিনদের সতর্ক করল ইসলামিক ফাউন্ডেশন

৬৬৩ বার পড়া হয়েছে
৪

সৎ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, নারী সহকর্মীর নাম ব্যবহার করে ভুয়া অভিযোগ

৬১৮ বার পড়া হয়েছে
৫

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন মহাপরিচালক মহিবুল্লাহিল বাকী

৫৭২ বার পড়া হয়েছে
৬

দুনিয়া হাতে থাকবে, অন্তরে নয়

৪৭২ বার পড়া হয়েছে
৭

আল্লাহ তাআলা আসমান ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন

৪৬৬ বার পড়া হয়েছে
৮

গাড়ি বিক্রির আড়ালে বিশ্বাস ইম্পোর্টসের প্রতারণা, মালিকানা নিয়ে জালিয়াতি

৪৬৬ বার পড়া হয়েছে
৯

দৌলতদিয়ায় যাত্রীবাহী বাস পদ্মায়, ২ মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজদের সন্ধানে উত্তাল নদীতে তল্লাশি

৪৫১ বার পড়া হয়েছে
১০

১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে শুরু হওয়া ইফার মউশিক প্রকল্প রাজস্বকরণের দাবি

৪৪১ বার পড়া হয়েছে