বিশেষ প্রতিবেদক: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবময় জনপদের নাম। একসময় এই জনপদ ছিল রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই প্রাচীন সোনারগাঁয়ের বুকে আজও দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী গোয়ালদি মসজিদ।
সময় বদলেছে। রাজা-বাদশাহ এসেছেন, চলে গেছেন। নগর বদলে গেছে, পথ বদলেছে। কিন্তু প্রায় পাঁচ শতাব্দী পেরিয়েও একটি ছোট্র একগম্বুজ মসজিদ আজও মানুষকে টেনে নেয় তার দিকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ইতিহাসের কোনো পুরোনো দরজা যেন এখনো খোলা আছে যে দরজা দিয়ে অতীতের বাংলার মুসলিম সমাজ, ইবাদত ও স্থাপত্যের জগতে প্রবেশ করা যায়।
গোয়ালদি মসজিদ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের গোয়ালদি গ্রামে অবস্থিত। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটি নির্মিত হয় ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে। মসজিদটির নির্মাতা ছিলেন মোল্লা হিজাবর আকবর খান। শিলালিপির তথ্যেও নির্মাণকাল ও নির্মাতার উল্লেখ রয়েছে।
আজকের পৃথিবী থেকে প্রায় পাঁচশ বছরেরও বেশি আগে। তখন আধুনিক নগর ছিল না, ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না যন্ত্রের কোলাহল। মানুষ দূর-দূরান্ত পাড়ি দিত পায়ে হেঁটে, নৌকায় কিংবা ঘোড়ার পিঠে। সেই সময়ের মানুষ আল্লাহর ঘর নির্মাণ করেছিলেন ইট, পাথর আর অসাধারণ কারুকার্যে।
গোয়ালদি মসজিদের স্থাপত্য ছোট হলেও এর সৌন্দর্য গভীর। এটি একটি একগম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকার মসজিদ। চার কোণে রয়েছে মিনারসদৃশ টাওয়ার। দেয়াল ও প্রবেশপথে সুলতানি আমলের অলংকরণের ছাপ রয়েছে। মসজিদের কিবলা দেয়ালে রয়েছে মেহরাব, আর ইট ও পাথরের নকশায় ফুটে উঠেছে তৎকালীন ইসলামী স্থাপত্যের স্বাতন্ত্র্য।
স্থাপত্যের দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে পড়ে-ইসলামের সৌন্দর্য শুধু বিশাল অট্টালিকায় নয়; সরলতা, ভারসাম্য ও সৌন্দর্যের মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটে।
একটি গম্বুজ।
চারটি কোণ।
একটি কিবলা।
আর অসংখ্য মানুষের সিজদার স্মৃতি।
স্থাপত্য যেন নীরবে বলে-মানুষ যতই ক্ষুদ্র হোক, তার রবের সামনে সিজদা তাকে সম্মানিত করে।
মসজিদের সঙ্গে সম্পর্কিত শিলালিপির তথ্য ইতিহাসবিদদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিলালিপিতে মসজিদ নির্মাণের সময়কাল ও সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ইসলামী ইতিহাসে মসজিদ কেবল নামাজ আদায়ের স্থান নয়। মসজিদ ছিল মুসলিম সমাজের হৃদয়। এখান থেকে মানুষ নামাজ শিখেছে, কোরআন শিখেছে, নৈতিকতা শিখেছে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছে।
তাই গোয়ালদি মসজিদের ইতিহাস শুধু একটি পুরোনো ভবনের ইতিহাস নয়। এটি বাংলার মাটিতে মুসলমানদের ইবাদত, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যচর্চারও একটি স্মারক। ইতিহাসের নির্মমতা হলো-সময় কোনো স্থাপত্যকেই চিরস্থায়ী রাখে না।
একসময় গোয়ালদি মসজিদও অবহেলা ও ক্ষয়ের মুখে পড়েছিল। পুরোনো নথিতে মসজিদটির জরাজীর্ণ অবস্থার বিবরণ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অনেকের মুখে গোয়ালদি মসজিদকে গায়েবী মসজিদ নামেও শুনতে পাওয়া যায়। তবে ঐতিহাসিক দলিল ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে এর প্রতিষ্ঠিত নাম গোয়ালদি মসজিদ। গায়েবী নামটির প্রচলনের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
তাই মসজিদটির সঙ্গে অলৌকিক কোনো কাহিনি যুক্ত করার পরিবর্তে এর প্রকৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সত্য ইতিহাসের সৌন্দর্য কোনো কিংবদন্তির চেয়ে কম নয়।
একটি মসজিদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার দেয়ালে নয়-তার সিজদায়। কত মানুষ এই মসজিদে এসে অজু করেছে, কত কপাল মাটিতে ঠেকেছে, কত চোখে অশ্রু এসেছে, কত মানুষ নিঃশব্দে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে-তার হিসাব কোনো ইতিহাসের পাতয়তো কোনো এক মুসাফির এখানে এসে দুই রাকাত নামাজতো কোনো বৃদ্ধ বাবা সন্তানের জন্য দোয়াবারের মতো আল্লাহর কাছে তওবা করেেসব গল্পের কোনো নাম নেই, কোনো ছবি নেই। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো সিজদাই অজসূরা আল-জিনায় লেখা নেই।
কোরআনে আল্লাহ বলেন-নিশ্চয়ই মসজিদগুলো আল্লাহরই জন্য।
-সূরা আল-জিন: ১৮
এই আয়াতের আলোকে একটি মসজিদের প্রকৃত মর্যাদা তার বয়সে নয়, বরং সেখানে আল্লাহর কতটা স্মরণ হয়েছে-সেই আমাদের কী শেখদি মসজিদের সামনে দাঁড়ালে আমরা শুধু ১৫১৯ সালের দিকে তাকাই না; বরং নিজেদের জীবন নিয়েও ভাবাঁচশ বছর আগে যারা এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, তাঁদের কেউ আজ পৃথিবাঁরা এখানে নামাজ পড়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশের নাম্লাহর ঘর আজটাই দেহ মাটিতে মিশে যায়, কিন্তু কোনো ভালো কাজ হয়তো শত শত বছর পরও মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালাতেসোনারগাঁয়ের গোয়ালদি মসজিদ তাই শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়। এটি আমাদের সামনে তিনটি বড় শিক্ষা তুলে দুনিয়ার কাজ মানুষের মৃত্যুর পরও তার পরিচয় বহ মুসলিম জীবনের কেন্দ্র-ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর ভাবনায়।
গোয়ালদি মসজিদের সামনে দাঁড়ালে আমরা শুধু ১৫১৯ সালের দিকে তাকাই না; বরং নিজেদের জীবন নিয়েও ভাবতে পারি। পাঁচশ বছর আগে যারা এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, তাঁদের কেউ আজ পৃথিবীতে নেই। যাঁরা এখানে নামাজ পড়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশের নামও আমরা জানি না। কিন্তু তাঁদের নির্মিত আল্লাহর ঘর আজও দাঁড়িয়ে আছে। এটাই দুনিয়ার বাস্তবতা। মানুষ চলে যায়, আমল থেকে যায়।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের গোয়ালদি মসজিদ তাই শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়। এটি আমাদের সামনে তিনটি বড় শিক্ষা তুলে ধরে-দ্বিতীয়ত, ভালো কাজ মানুষের মৃত্যুর পরও তার পরিচয় বহন করতে পারে। তৃতীয়ত, মসজিদ মুসলিম জীবনের কেন্দ্র-ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর স্মরণের স্থান।
পাঁচ শতাব্দী ধরে গোয়ালদি মসজিদ যেন নীরবে সেই কথাইাসক বদুষের নাম বিস্মৃত হয়্লাহর ঘরের ইতিহাসোনারগাঁয়ের সবুজ-শ্যামল পরিবেশের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা গোয়ালদি মসজিদ তাই শুধু অতীতের একটি স্থাপনা নয়-এটি বাংলার মুসলিম ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী এবং আমাদের জন্য আত্মজিজ্ঞাসার একটি সুন্দর উপল মসজিদকে ভালোবাসার, নামাজ কায়েমের এবং এমন আমল করার তাওফিক দিন-যে আমল আমাদের চলে যাওয়ার পরও মানুষের বলে যাচ্ছে।
সময় চলে যায়।
শাসক বদলায়।
নগর হারিয়ে যায়।
মানুষের নাম বিস্মৃত হয়।
কিন্তু আল্লাহর ঘরের ইতিহাস থেকে যায়।
সোনারগাঁয়ের সবুজ-শ্যামল পরিবেশের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা গোয়ালদি মসজিদ তাই শুধু অতীতের একটি স্থাপনা নয়-এটি বাংলার মুসলিম ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী এবং আমাদের জন্য আত্মজিজ্ঞাসার একটি সুন্দর উপলক্ষ।
হয়তো এই মসজিদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই-মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর জন্য করা কাজের প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
আল্লাহ আমাদের মসজিদকে ভালোবাসার, নামাজ কায়েমের এবং এমন আমল করার তাওফিক দিন-যে আমল আমাদের চলে যাওয়ার পরও মানুষের উপকারে আসে।